আটক হচ্ছে, মারাও পড়ছে, তবুও থেমে নেই ইয়াবা পাচার

pic-u-2.jpg

উখিয়া ক্রাইম নিউজ ডেস্ক::

ইয়াবা পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কলম ধরলেই হত্যা, ভয়ভীতি, মিথ্যা মামলা, গুম, খুন করার হুমকি ও প্রভাবশালীদের ফোনসহ আর কত কিছু ? অথচ সভা সমাবেশে গলা লম্বা করে মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলে তারা ?
উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়নের কুতুপালং গ্রামের রশিদ আহম্মদের ছেলে আলী আকবর (৪০) বছর বয়সী এ ব্যাক্তি পাচঁ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন, সদা হাস্যজ্জলমুখ, সকাল সন্ধা কুতুপালং বাজারে তার বিচরন। এমনকি বিভিন্ন শ্রেনী পেশার মানুষের পাশাপাশি পুলিশের সাথেও তার উঠাবসা। অথচ পুলিশ বিন্ধুমাত্র টেরপাইনি আলী আকবর যে একজন পেশাদার ইয়াবাকারবারী। প্রাইভেট কারভর্তি ইয়াবার চালান নিয়ে ঢাকা যাওয়ার পথে কুমিল্লার সুচতুর পুলিশ সদস্যরা প্রাইভেট কার তল্লাশি চালালে বেরিয়ে আসে আসল রহস্য। উক্ত প্রাইভেট কারের ভিতর থেকে বিপুল পরিমান ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় কুমিল্লা সদর থানায় একটি মাদক নিয়ন্ত্রন আইনে মামলা হয়েছে। জেল থেকে বের হয়ে ফের আগের পথে। সম্প্রতি আলী আকবরের মাদক ব্যবসা নিয়ে পত্রিকায় সংবাদ প্রচারের জের ধরে তার ছোট ভাই এমএসএফ হাসপাতাল কুতুপালংয়ে কর্মরত গোলাম আকবর কেন তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে পত্রিকায় লেখা হয়েছে মর্মে ক্ষুব্দ হয়ে সাংবাদিককে হুমকি দেয়।
অল্প পুজিতে প্রচুর লাভবান, স্বল্প সময়ে কোটিপতি, গাড়ী বাড়ির মালিক হওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে শতশত নতুন মুখ ইয়াবা বানিজ্যের সাথে জড়িয়ে পড়ছে। আইনশৃংখলা বাহিনীর হাতে নিয়মিত আটক হচ্ছে ইয়াবাকারবারী। উদ্ধার করা হচ্ছে ইয়াবা। পরবর্তীতে এদের অনেকেই বন্ধুকযুদ্ধে মারাও পড়ছে। তবুও থেমে নেই দেশ জাতি ও সমাজ ধ্বংসকারী ইয়াবার আগ্রাসন। পালংখালী ইউনিয়নের বালুখালী বানুর বাপের খিল গ্রামের লেবার নুর আহম্মদের ছেলে মাছন (৩৫) পেশায় একজন গাড়ী চালক। টেকনাফের শীর্ষ ও তালিকাভুক্ত ইয়াবা পাচারকারীর পাটনার এই মাছন রাতারাতি কোটিপতি, গাড়ীবাড়ি ও জমিজমার মালিক হয়ে যাওয়ার ঘটনা নিয়ে এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়। সাধারন গ্রামবাসী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের প্রশ্ন এতটাকা সে পেল কোথাই থেকে।
থাইংখালী ঘোনার পাড়া গ্রামে গিয়ে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, থাইংখালী বাজার সংলগ্ন পূর্ব পাশে গড়ে উঠা বিশাল একটি ভবন। যে ভবনের কাজ এখনো শেষ হয়নি। তবুও মানুষ এই ভবন মালিক নিয়ে বিভিন্ন আলাপ আলোচনা করছে। দুদু মিয়া নামের একজন প্রত্যক্ষদর্শী, জিনি তার পারিবারিক বৈশিষ্টতা সম্পর্কে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন। তিনি জানান, এ গ্রামের এক সময়ের হতদরিদ্র নুর মোহাম্মদ প্রকাশ নুইজ্যার ছেলে গোরা মিয়ার বাড়ীটি নির্মান করছে। তার বড় ভাই জসিম উদ্দিন ও বিপুল পরিমান ইয়াবার চালান আটক হয়ে জেল হাজতে রয়েছে। গোরা মিয়া বর্তমানে জামতলীস্থ তার ২য় স্ত্রী কাছে থাকেন এবং ওই খানেও ইয়াবার কালো টাকার পাহাড় দিয়ে আলিশান ভবন নির্মান করেছে বলেও জানা গেছে। থানা সূত্রে জানা গেছে, তার বিরুদ্ধে একাধিক মাদক নিয়ন্ত্রন আইনে মামলা রয়েছে। এরকম ইয়াবাকারবারীর সংখ্যা নির্ণয় করা অনেকেরই সম্ভব হবেনা। ইয়াবা ব্যবসা করে রাতারাতি আট্রালিকা সম্পদের মালিক হয়েছে। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে মাদক আইনের সংশ্লিষ্ট ধারাই কোন মামলা না থাকায় পুলিশ তাদের আটক করতে হিমশিম খাচ্ছে। তারা কিন্তু এলাকায় সাদু সেজে সমস্ত মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রন করছে। পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি সদস্য নুরুল আমিন। সে পেশায় একজন লেবার ছিল। ইয়াবার ব্যবসার সাথে জড়িয়ে অল্প দিনে গাড়ী,বাড়িসহ আট্রালিকা সম্পদের মালিক। ইয়াবার কালো টাকার পাহাড় দিয়ে বনে গেলেন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার। গ্রেপ্তার এড়াতে ছাড়লেন এলাকা। বর্তমানে তার ইয়াবা ব্যবসা নিয়ন্ত্রন ও মেম্বারি দায়িত্ব পালন করছে তার ছোট ভাই আরেক ইয়াবাকারবারী রুহুল আমিন।
বিভিন্ন দায়িত্বশীল সূত্রে ও এলাকাবাসীর তথ্যমতে উখিয়ার খয়রাতি গ্রামের আলী আহম্মদের ছেলে আতাউল্লাহ, পালংখালী ইউনিয়নের থাইংখালী সীমান্তের ইয়াবা ব্যবসায়ীদের জনক কলিমুল্লা বলির ছেলে কামাল উদ্দিন, জামতলী গ্রামের ইউনুছ খলিফা, একই গ্রামের ইয়াবা রকিম, রতœাপালং ইউনিয়নের তেলী পাড়া গ্রামের বাছা মিয়ার ছেলে জাহাঙ্গীর, উখিয়ার তুতুরবিল গ্রামের মৃত নাছির উদ্দিনের ছেলে নুরুল হাকিম, টিএন্ডটির ম্যাডাম বেবী, বালুখালী শিয়াইল্লা পাড়া গ্রামের মৃত ইয়াকুব আলীর ছেলে আকবর আহম্মদ প্রকাশ ইয়াবা আকবর, বালুখালী জুমের ছড়া গ্রামের লম্বাপুতিয়ার ছেলে ফরিদ প্রকাশ ইয়াবা ফরিদ,দলিলুর রহমানের ছেলে রিয়াজুল হক প্রকাশ ইয়াবা রিয়াজ, একই এলাকার আহম্মইদ্যার ছেলে শাহজান প্রকাশ ইয়াবা শাহজান, আনর আলীর ছেলে মঞ্জুর, হাকিম পাড়া গ্রামের মৃত ইলিয়াছের ছেলে সাহাব উদ্দিন প্রকাশ ইয়াবা সাহাব উদ্দিন, রহমতেরবিল এলাকার জালাল আহম্মদের ছেলে আনোয়ার প্রকাশ ইয়াবা আনোয়ার, রহমতেরবিল গ্রামের ছৈয়দ আলমের ছেলে জমির উদ্দিন, সিরাজুল হকের ছেলে শাহাজান, আবু ছিদ্দিকের ছেলে হেলাল প্রকাশ লাল পুতিয়া, মৃত কলিমুল্লার ছেলে হারুন প্রকাশ ইয়াবা হারুন, পালংখালী গয়ালমারা গ্রামের মৌলভী ইয়াছিনের ছেলে জামাল উদ্দিন, আনর আলীর ছেলে মঞ্জুর,রহমতেরবিল গ্রামের মৃত মকতুল হোসনের ছেলে কামাল উদ্দিন প্রকাশ ইয়াবা কামাল, পালংখালীর ইয়াবা রাসেলসহ শীর্ষরা দীর্ঘ দিন ধরে সাগর ও সড়ক পথে হাড়ি হাড়ি ইয়াবা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাচার করে রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলা গাছে পরিণত হয়েছে, বিভিন্ন স্থানে শতাধিক গডফাদারের নেতৃত্বে পুরো উখিয়ায় অন্তত ২০টি সিন্ডিকেট মোটা দাগের ইয়াবা লেনদেন ও পাচার কাজে লিপ্ত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সচেতন অভিভাবকদের অভিমত, বর্তমান ভয়াবহ জঙ্গী ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের সাথে যেসব কিশোর, যুবক জড়িয়ে পড়েছে, তাদের একটি অংশ মাদকাসক্ত ও মাদক পাচারের সাথে কোন না কোনভাবে সম্পৃক্ত রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অপর দিকে, কক্সবাজার র‌্যাব-১৫ এর সদস্যরা অভিযান চালিয়ে শনিবার ভোর রাতে উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়নের পূর্ব ডিগলিয়া এলাকা থেকে ২২ হাজার ৩ শ ৫০ পিস ইয়াবা সহ ৩ ইয়াবা পাচারকারীকে আটক করে শনিবার সকালে উখিয়া থানায় সোপর্দ্দ করেছে। র‌্যাব- ১৫ এর সহকারী পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ মোহাম্মদ শেখ জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তাদেরকে আটক করা হয়েছে। আটককৃতরা হলেন, পূর্ব ডিগলিয়া গ্রামের মৃত সোলতান আহমদ ভেন্ডারের ছেলে ছৈয়দ আলম (৪৫), চাকবৈঠা গ্রামের আবদুস শুক্কুরের ছেলে মোঃ নুরুল ইসলাম (৫০) ও পূর্ব ডিগলিয়াপালং গ্রামের আলী আহমদের ছেলে নুরুল ইসলাম (২৭)। তাদের বিরুদ্ধে র‌্যাব বাদী হয়ে উখিয়া থানায় সংশ্লিষ্ট আইনে মামলা রুজু করা হয়েছে বলে উখিয়া থানার ওসি মর্জিনা আক্তার মরজু জানিয়েছেন।
মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্ছার সমাজকর্মী লিয়াকত আলী, উসমান গণিসহ আরো অনেকেই বলেন, ইয়াবাকারবারীদের অতীত আর বর্তমান সহায় সম্পক্তির ব্যাপারে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা তদন্ত করলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে। পূর্বাঞ্চলীয় মাদক বিরোধী সংগঠনের নেতা এড. এটি এম রশিদ আহম্মদ বলেন, ইয়াবার মাধ্যমে গজে উঠা অঢেল সহায় সম্পক্তি সরকারি কোষাঘারে নিয়ে যাওয়া হলে ইয়াবাকারবারীদের এ পেশা ছেড়ে দেওয়া ছাড়া অন্য কোন উপায় ছিলনা। যেহেতু আইন প্রয়োগকারী সংস্থা মাদক নিয়ন্ত্রনে এক পায়ে খাড়া। তিনি আরো বলেন, বর্তমানে রোহিঙ্গা ক্যাম্প গুলো ইয়াবার বাজারে পরিনত হয়েছে। এদের মাধ্যমে ইয়াবার সাথে সম্পৃক্ত হচ্ছে স্থানীয় যুবসমাজ, স্কুল কলেজ পড়–য়া ছাত্রÑ ছাত্রী। ইয়াবা পাচার করতে গিয়ে ইয়াবা সেবনে অভ্যস্থ হচ্ছে ৮০ শতাংশ পরিবারের কোন না কোন সদস্য। এদের কারনে পারিবারিক সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে অভিভাবকদের অভিমত।

উখিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ মরর্জিনা আক্তার মরজু, মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে জিরো ট্রলারেন্স ঘোষনা করেন এবং মাদক কারবারী সে যেই হোক না কেন কাউকে ছাড় দেওয়া হবেনা বলে তিনি জানান।

Share this post

scroll to top