আবছার মেম্বার আটক – জামায়াত নেতা গফুর উল্লাহসহ শীর্ষরা গাঁ ঢাকা দিয়েছে

o.jpg

উখিয়া ক্রাইম নিউজ ডেস্ক::

২০১৩ সাল। উখিয়ার উপকূলীয় এলাকায় প্রতিষ্ঠিত ‘সী কিং’ হ্যাচারিতে স্বল্প বেতনে চাকরি করতেন আবছার। এরপর চাকরি ছেড়ে অপরাধ জগতে ধীরে ধীরে পা বাড়িয়ে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠা বিশাল অংকের কালো টাকার বিনিময়ে ২০১৬ সালে ইউপি সদস্য নির্বাচিত হন। এ পদকে ব্যবহার করে মাত্র চার বছরেই আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে যান নুরুল আবছার চৌধুরী। তবে এর নেপথ্যে রয়েছে বাংলাদেশ-মিয়ানমার ভিত্তিক একটি শক্তিশালী স্বর্ণচোরাচালান ও ইয়াবা পাচার সিন্ডিকেট। বেশ কয়েকটি স্বর্ণের দোকানের মালিক স্থানীয় একজন জামায়াত নেতা ও একাধিক মামলার আসামী গফুর উল্লাহ তার ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে নুরুল আবছারের অর্থের উৎস নিয়ে কানাগুষা শুরু হয়। ক্রমান্বয়ে আত্মপ্রকাশ করতে থাকে তার মাদক নিয়ন্ত্রণ ও কারবারের আসল তথ্য। সু-চতুর বালুখালী রাজ্যের ইয়াবা ও স্বর্ণ চোরাচালান সম্রাট নুরুল আবছার তার অভিনব কায়দা ও সু-পরিকল্পিত সুমধুর ব্যবহার দিয়ে চোরাচালান বিরোধী বিভিন্ন মহলকে ম্যানেজ করে অতি অল্প সময়ে টাকার পাহাড় গড়ে তুলে। পাশাপাশি তার সিন্ডিকেটের সংখ্যা বাড়তে থাকায় বালুখালী ভিত্তিক গড়ে উঠে একটি অপরাধ জগতের সংঘবদ্ধ চক্র।
তবে ২০১৭ সালে যখন বাংলাদেশে রোহিঙ্গা আসতে শুরু করে তখন নুরুল আবছার চৌধুরীর চোখ কপালে উঠে যায়। ফুলে যায় তার অর্থের দুয়ার। প্রসার বাড়তে থাকে ইয়াবা ও স্বর্ণ চোরাচালানের সীমাবদ্ধতা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এলাকার বেশ কিছু গ্রামবাসী জানায়, চোরাচালান প্রতিরোধে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা তৎকালীন সময়ে সীমান্তে কঠোর আরোপ ও নজরদারী বিদ্ধমান থাকলেও রোহিঙ্গা ঢলের কারণে পাচার বৃদ্ধি পেতে থাকে। তারা বলেন, বিশাল সীমান্ত এলাকা জুড়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গার আগমনে সীমিত সংখ্যক আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা কোন ভাবেই আইনশৃঙ্খলা ও চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিল না। তথাপিও তারা প্রতিমাসে সীমান্ত এলাকায় স্থানীয়দের নিয়ে চোরাচালান বিরোধী সমাবেশ করে পাচার কাজ অনেকটা সীমাবদ্ধতায় রাখতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক পদের আড়ালে নুরুল আবছার তার অবৈধ ব্যবসা অব্যাহত রেখেছে।
ইউপি সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর সরকার দলীয় রাজনীতিতেও নিজের বেশ শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেন এ জনপ্রতিনিধি। ভাগিয়ে নেন উখিয়া উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদকের পদটি। টাকা উড়িয়ে হয়ে যান বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন উখিয়া উপজেলার শাখার সভাপতি। নিজেকে পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যানও দাবী করতেন। সব ক্ষমতাই ব্যবহার করতেন অবৈধ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের জন্য। আবছারের এসব অবৈধ কর্মকান্ডের দীর্ঘ নজরদারী ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করতে থাকেন উখিয়ার তিন সদস্যের একটি প্রবীণ সাংবাদিক জুটি। অনুসন্ধানে উঠে আসে রাতারাতি কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়ার পিলে চমকানো তথ্য। অনুসন্ধানে তার ইয়াবা পাচার ও কালো টাকা আয়ের অনেক ডকুমেন্ট তারা সংগ্রহ করেছে।

২০১৬ সালের ১৮ জুন পালংখালী ইউনিয়নের ১নং ওয়াডের্র ইউপি সদস্য পদে নির্বাচন করার জন্য নুরুল আবছার বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের কাছে হলফনামা জমা দেন। ওই হলফনামা কয়েকমাস আগে সংগ্রহ করে অনুসন্ধানী টিম। সেখানে ব্যাংকে থাকা অর্থের পরিমাণের ‘স্থলে’ বেশ ঘষামাজা করে নির্বাচনের পর যে সংখ্যা পরিবর্তন করেছেন তা স্পষ্ট হয়েছে। তবুও ২০১৬ সালে হলফনামায় যে অর্থ উল্লেখ করেছিলেন সেটি মাত্র চার বছরে বহুগুণ ছাড়িয়ে গেছে। অথচ দৃশ্যমান কোন ব্যবসা উল্লেখ ছিল না হলফনামায়। নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামায় নুরুল আবছার উল্লেখ করেন, নগদ টাকা হিসেবে তার রয়েছে মাত্র ১৫ হাজার টাকা। আর ব্যাংকে জমা রয়েছে ৯ লাখ ৩৫ হাজার টাকা।
এ ৯,৩৫০০০ টাকা লেখার ক্ষেত্রে ‘৯’ এর জায়গায় বেশ কৌশলে ঘষামাজা করে সংখ্যা পরিবর্তন করেছেন। স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে সংশ্লিষ্টদের যোগসাজসে ‘১’ সংখ্যাটাকে ‘৯’ বানানো হয়েছে। কিন্তু তাও বর্তমান অর্থের পরিমাণের সাথে সেটির বহুগুণ পার্থক্য। হলফনামায় তিনি আয়ের খাত এবং সেখান থেকে আয় হিসেবে দেখিয়েছেন, তার কৃষি জমি রয়েছে ২ কানি। কৃষি খাত থেকে তার আয় মাত্র ৩০ হাজার টাকা। ব্যবসা থেকে তার আয় ১ লাখ ১০ হাজার টাকা। কিন্তু কি ব্যবসা সেটি উল্লেখ করা হয়নি। বাড়ি, গাড়ি সহ অন্যান্য কোন কিছুই উল্লেখ করা হয়নি সেই সময় জমা দেওয়া হলফনামায়।

২০১৬ সালের জুন থেকে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত মাত্র অল্প সময়ে অনেক বেশি পরিবর্তন এসেছে আবছারের অর্থ-সম্পদে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা আসার পর থেকে অর্থ-সম্পদের জোয়ার শুরু হয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, হলফনামায় বাড়ি উল্লেখ না থাকলেও বর্তমানে আবছার দুটি তিন তলা বিশিষ্ট ভবন এবং ১টি টিনশেডের বিশাল কলোনী রয়েছে। এই তিনটি বাড়িই একই বাউন্ডারীর ভেতর এবং নির্বাচনের পরই বাড়িগুলো নির্মাণ করেছে বলে স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
স্থানীয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেয়া তথ্যমতে, এই তিনটি বাড়িই ইয়াবা ব্যবসার কেন্দ্রবিন্দু। এছাড়া তিনি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরের বলীবাজারেও ইয়াবা ও স্বণের্র গোডাউন গড়ে তুলেছেন। ইউপি সদস্য নুরুল আবছার চৌধুরী ২টি ভবন এবং ১টি টিনশেড কলোনীর এই তিনটি বাড়ি গড়ে তুলেছেন বালুখালীতে নাফনদীর সীমানা ঘেঁষে। এই তিনটি বাড়ির বাউন্ডারীর মধ্যে প্রধান গেইট পশ্চিম দিকে। আর নাফনদীর দিকে আরেকটি গেইট করেছেন। যেটি সব সময় খোলা থাকে না।

সূত্রমতে, নাফনদীর অংশের গেইট দিয়েই নাফনদী থেকে ইয়াবার চালান তুলেন নুরুল আবছার সিন্ডিকেট। এরপর সেই ইয়াবা পাচারের জন্য চলে যায় রোহিঙ্গা শিবিরের বলীবাজারে এবং ট্রাকের চালকের মাধ্যমে চট্টগ্রামে। এজন্য জোগানে জোগানে মানুষ ঠিক করে রাখা আছে আবছারের। চট্টগ্রামের একটি ট্রান্সপোর্ট অফিসে সামান্য বেতনে চাকরি করেন নুরুল আবছারের অন্যতম সহযোগী লুৎফুর রহমান। তার বিরুদ্ধে রামু থানায় একটি ইয়াবা মামলা রয়েছে। ট্রান্সপোর্টে চাকরি করে আয় করা মূল উদ্দেশ্য নয়, তার প্রধান কাজ ইয়াবা পাচার নিয়ন্ত্রণ করা। এসব তথ্য জানা গেছে বালুখালী এলাকার একটি বিশেষ মহল থেকে।

সম্পদ বিবরণী অনুসন্ধান করে ও স্থানীয় গ্রামবাসীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, রোহিঙ্গা শিবির থেকে চালান সংগ্রহ ও সরবরাহ দেওয়ার জন্য ক্যাম্পের বলীবাজারে ৪০টিরও বেশি দোকান আবছারের নিয়ন্ত্রণে। ওই সব দোকানে সারাদিন কোনকিছু বিক্রি না হলেও যারা দোকান করেন তারা অঢেল টাকার মালিক। এই দোকানগুলো থেকে ইয়াবা ও স্বর্ণ পাচারের বিষয়টি এলাকায় বেশ আলোচিত থাকলেও তার ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস করেনি। বালুখালীতে প্রতিষ্ঠিত ‘ক্যাফে হাইওয়ে’ রেস্তোরাঁর অন্যতম অংশীদার নুরুল আবছার। ক্যাম্পের বলীবাজারে আবছারের ইয়াবা সিন্ডিকেটের অন্যতম পার্টনার রোহিঙ্গা গ্রাম ডাক্তার ওসমানের সাথে অংশীদারে একটি বিশাল ফার্মেসী রয়েছে। ওই ফার্মেসী ইয়াবা ও স্বর্ণ চোরাচালানের অন্যতম কার্যালয়। বালুখালী পানবাজারে আবছারের বিশাল মুদির দোকান রয়েছে। সেখানে বেশ কয়েকটি পণ্যের ডিলারশীপ নিয়েছেন তিনি। এক সময় কোন গাড়ি না থাকলেও বর্তমানে তিনি ১ টি নোয়া (নোহা), ১ টি ডাম্পার ও ১টি ট্রাকসহ বেশকিছু গাড়ি, বাড়ি ও জমির মালিক। তার বড় ট্রাকটি চলাচল করে কক্সবাজার-চট্টগ্রাম-ঢাকা মহাসড়কে। এটিও মাঝে মধ্যে ইয়াবার চালান বহন করে থাকে বলে বিশ^স্ত সূত্রে জানা গেছে। বালুখালী পূর্বপাড়ায় নাহার কবিরের কাছ থেকে বেশকিছু জমি কিনেছেন তিনি। নুরুল আবছারের অন্যতম ইয়াবা পার্টনার (সম্প্রতি একসাথে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার) নুরুল আলমের কাছ থেকেও জমি ক্রয় করেছেন। ক্যাফে হাইওয়ে রেস্তোরাঁর পাশে বেশকিছু জমি কিনেছেন তিনি। বালুখালী পশ্চিমপাড়ায় তার জমির উপর হাসপাতাল করেছে ‘এমএসএফ’। আবছারের সিন্ডিকেটের কয়েকজন সদস্য এবং স্থানীয় একটি সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালের শুরুর দিকে পালংখালীর শীর্ষ একজন ইয়াবা গডফাদারের ইয়াবার একটি চালান লুট করেন নুরুল আবছার। সেই ইয়াবা লুটে একসঙ্গে তিনি প্রায় ৭০ লাখ টাকার মালিক বনে যান ।

জানা গেছে, নুুরুল আবছার চৌধুরী সিন্ডিকেটের সদস্যদের অনেকে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন এবং অনেকে কারাগার থেকে জামিনে বের হয়ে আবারও ইয়াবা ব্যবসায় জড়িয়ে গেছেন। এরমধ্যে অন্যতম নুরুল আমিন। তিনি বর্তমানেও ইয়াবা মামলায় কারাগারে আছেন। আরেক সদস্য ও তার খালাতো ভাই মনু সম্প্রতি ইয়াবা মামলায় চট্টগ্রাম কারাগার থেকে জামিনে বের হয়েছেন। উল্লেখ্য, দীর্ঘদিন বেপরোয়াভাবে ইয়াবা কারবার চালিয়ে আসলেও গত ১৩ জুলাই রাতে নিজ বাড়ির সামনে ইয়াবা লেনদেনের সময় ইয়াবা ডন নুরুল আবছার চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। এসময় তার আরেক পার্টনার কমিউনিটি পুলিশ ও কৃষকলীগের নেতা আমিন চৌধুরীকেও গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ১০ হাজার পিস ইয়াবা।
অভিযানে একটি অলিখিত চেক ও একটি স্বাক্ষরকৃত ছয়লক্ষ টাকার ব্যাংক চেক, ৩ টি এটিএম কার্ড, স্বাক্ষরকৃত ২ টি অলিখিত স্ট্যাম্প উদ্ধার করা হয় বলে জানিয়েছেন র‌্যাব-১৫ এর সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) আবদুল্লাহ মোহাম্মদ শেখ সাদী। র‌্যাব-১৫ এর সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) আবদুল্লাহ মোহাম্মদ শেখ সাদী বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র‌্যাব জানতে পারে যে, কতিপয় মাদক ব্যবসায়ী বালখালী পূর্বপাড়া এলাকার নুরুল আবছার চৌধুরীর বসতঘরের সামনে ইয়াবা ট্যাবলেট বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে অবস্থান করছে। নুরুল আবছার চৌধুরীর স্বীকারোক্তির বরাত দিয়ে তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মাদকদ্রব্য ইয়াবা ট্যাবলেট কক্সবাজার জেলার টেকনাফ ও উখিয়া সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে সংগ্রহ করে কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় পাচার করে আসছে তারা। তাদের একটি বিশাল সিন্ডিকেটও রয়েছে। নুরুল আবছার চৌধুরী ও নুরুল আলমকে রিমান্ডে এনে তাদের সিন্ডিকেটের রাঘববোয়ালদের বের করার দাবী তুলেছেন সচেতন মহল।

Share this post

scroll to top