বনজ সম্পদ ও জীববৈচিত্রের ক্ষয়ক্ষতি’ উন্নয়নে কাজ শুরু হয়নি

Ukhiya-Pic-16.10.2020.jpg

উখিয়া ক্রাইম নিউজ ডেস্ক::

রোহিঙ্গাদের আবাসস্থল, স্যানিটেশন, গোসলখানা প্রভৃতি নির্মাণ করতে গিয়ে বনভূমির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পাশাপাশি জীববৈচিত্র তাদের আবাসস্থল হারিয়ে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এসবের উন্নয়নের জন্য গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হলেও গত এক বছরেও কাজ শুরু করা হয়নি বলে জানিয়েছেন বনবিভাগ। তাদের দাবী বন্য হাতি চলাচলের রাস্তার উপর ঝুঁপড়ি নির্মাণ করার কারণে প্রতি মাসেই রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর ভাংচুর করা হচ্ছে। আমন ফসল নষ্ট হচ্ছে। ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে বসতবাড়ির ফলজ ও বনজ গাছগাছালি। বন্য হাতির ভয়ে অনেককে নির্ঘূম রাত কাটাতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ৫ নভেম্বর বনবিভাগের পক্ষ থেকে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে দেয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অব ফরেষ্ট্রি এন্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেসের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামাল হোসাইনকে প্রধান করে গঠিত এই ‘বিশেষজ্ঞ কমিটি’তে আরো রয়েছেন একই বিভাগের প্রফেসর ও বনসম্পদ অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ ড. মো. দানেশ মিয়া, ঢাকাস্থ ইস্টওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবেশ অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ ড. একেএম এনামুল হক। কমিটিতে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক আবদুল আউয়াল সরকার ছাড়াও পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিনিধি, বাংলাদেশ বন গবেষণা ইন্সটিটিউট (বিএফআরআই) চট্টগ্রামের প্রতিনিধি, আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা (আইইউসিএন) এর প্রতিনিধি ও জেলা প্রশাসনের একজন করে প্রতিনিধিকে রাখা হয়েছে।
কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগ সূত্রে জানা যায়, একই বছরের ১৮ অক্টোবর কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত ‘জাতীয় সংসদে’র ‘বন ও পরিবেশ বিষয়ক সংসদীয় কমিটি’র বৈঠকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কারণে ধ্বংস হওয়া বনজ সম্পদ এবং জীববৈচিত্রের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ২৪২০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে জীববৈচিত্রের ক্ষতি ১৮২৯ কোটি টাকা এবং বনজ দ্রব্যের ক্ষতি ৫৯১ কোটি টাকা বলে ধরা হয়।
কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে নতুন পুরনো মিলে ৩৪ টি শরণার্থী শিবিরে সরকারের হিসাব অনুযায়ী ১১ লাখ ১৯ হাজার রোহিঙ্গা বসবাস করছে। বনবিভাগের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ের কারণে ৮ হাজার একর বন ধ্বংস হয়েছে। এরমধ্যে বসতি নির্মাণ করা হয়েছে ৬ হাজার ১৬৪ একরের উপর। আর রোহিঙ্গাদের জ্বালানী কাঠ সংগ্রহের ফলে ধ্বংস হয়েছে আরো ১ হাজার ৮৩৭ একর বনভুমি। সেখানে শত বছরের প্রাকৃতিক বন ছিল ৪ হাজার ১৩৬ একর এবং সামাজিক বন ছিল ২ হাজার ২৭ একর।
এ সম্পর্কে কমিটির প্রধান ‘বিশেষজ্ঞ’, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অব ফরেষ্ট্রি এন্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেসের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামাল হোসাইন বলেন, গত বছরের নভেম্বরের শুরুতে এ কমিটি গঠনের পর থেকেই মুখিয়ে আছি আমরা কবে কাজ শুরু করব। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে বনবিভাগ বিষয়টি ঝুলিয়ে রেখেছে। চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক আবদুল আউয়াল সরকার বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কারণে বনভুমি, বনজ সম্পদ, জীববৈচিত্র ও পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে গঠিত ‘বিশেষজ্ঞ কমিটি’র কর্মকান্ড চালানোর জন্য এখনও কোন অর্থ বরাদ্দ আসেনি। ফলে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজও শুরু করা যায়নি।
কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো: হুমায়ুন কবির জানান, মহেশখালীতে বাস্তবায়নাধীন ‘ইনস্টলেশন অব সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং’ প্রকল্পে যেসব বিষয়ের উপর ভিত্তি করে বন, পরিবেশ ও জীববৈচিত্রের ক্ষতি নির্ণয় করা হয়েছে, সেই পদ্ধতিতেই উখিয়া-টেকনাফে রোহিঙ্গাদের কারণে ক্ষতিগ্রস্থ বনজ ও জীববৈচিত্রের ক্ষয়-ক্ষতি নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু ক্ষয়-ক্ষতি নিরূপণের জন্য বিশেষজ্ঞ কমিটি ব্যবহার করা হয়নি। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে যে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে সেখানে সৃজিত বন, প্রাকৃতিক বন ও আর জীববৈচিত্রের মূলত তিনভাগে ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে।
উখিয়া বনরেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী তরিকুল ইসলাম বলেন, উদ্ভিদ বিজ্ঞানের ভাষায় নিম গাছ হল পলিউষন ক্লিনার, যে দূষিত বাতাসকে পরিশুদ্ধ করে। আর মাত্র ১০ বছর বয়সী একটি তেঁতুল গাছ যে পরিমাণ অক্সিজেন উৎপাদন করে তা ১৫০ জন মানুষের জন্য যথেষ্ট। একজন মানুষের অক্সিজেনের জন্য ২৫ বর্গফুটের উদ্ভিদ আচ্ছাদন প্রয়োজন। বৃক্ষ শুধু অক্সিজেন উৎপাদন করেনা, দূষিত কার্বণও শোষণ করে। আর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কারণে এই ধরনের লক্ষ লক্ষ বৃক্ষ ও হাজার হাজার প্রাণী হারিয়ে গেছে। আর হারিয়ে যাওয়া এ বনের কার্বন শোষন ও অক্সিজেন উৎপাদন মূল্যায়ন এবং পশু-পাখিসহ অন্যান্য প্রাণীর হারিয়ে যাওয়ার পরিবেশগত ক্ষতিকর প্রভাব নিরূপণ জরুরী বলে মনে করেন পরিবেশবিদগণ।

Share this post

scroll to top