আরো ২ সহস্রাধিক রোহিঙ্গা ভাসানচরে যাচ্ছে

Ukhiya-Pic-10.01.2021.jpg

উখিয়া ক্রাইম নিউজ ডেস্ক::

ভাসানচরে স্থানান্তরে রোহিঙ্গাদের মধ্যে ক্রমশ উৎসাহ উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়েছে। এবার রোহিঙ্গারা নিজেরাই পরিবারের তালিকা হস্তান্তর করছে স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের জন্য। আগামীকাল মঙ্গলবার তৃতীয় দফায় ভাসানচরে যাওয়ার কথা থাকলেও তা আপাতত হচ্ছে না। এ মাসের শেষের দিকে আরো ২ সহ¯্রাধিক রোহিঙ্গা ভাসানচরে স্থানান্তরের জন্য যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে বলে দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে। ক্যাম্প- ডব্লিউ ও ফোর ইষ্ট ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতারা জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে দুই ক্যাম্পের ১৩০ পরিবারের রোহিঙ্গারা স্ব-ইচ্ছায় ভাসানচরে যাওয়ার জন্য সিআইসি’র নিকট তালিকা জমা দিয়েছে।
সূত্রে জানা গেছে, বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের নিয়ে নানা সংকটে রয়েছে সরকার। পরিবেশের ক্ষতি তো আছেই, সঙ্গে যোগ হয়েছে মাদক, ডাকাতি, খুনাখুনিও। মিয়ানমার থেকে আসা ইয়াবা বিক্রিতে জড়িয়েছে এদের অনেকেই। মাদকের টাকার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে মারামারি খুনাখুনি লেগেই আছে। তাদের এসব কর্মকান্ড প্রতিরোধ, নজরদারি এবং রোহিঙ্গাদের নিজের দেশে ফেরত পাঠাতে কূটনৈতিক তৎপরতাসহ নানা উদ্যোগ হাতে নিয়েছে সরকার। এরই মধ্যে নোয়াখালীর ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের কাজ শুরু হয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় দফায় ৩ হাজার ৪ শত ৪৬ জন রোহিঙ্গাকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তৃতীয় দফায় যেতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে আরও প্রায় দুই সহস্রা ধিক।
কুতুপালং রেজিষ্ট্রার্ড ক্যাম্পের চেয়ারম্যান হাফেজ জালাল আহমদ জানান, প্রথম দিকে রোহিঙ্গারা ভাসানচরে যেতে অনিহা প্রকাশ করলেও এ সমস্যা এখন আর নেই। ভাসানচরে বর্তমান পরিবেশগত উন্নয়ন ও রোহিঙ্গাদের থাকা খাওয়ার ব্যাপারে সরকারের সদিচ্ছার কারণে ভাসানচরে যাওয়ার জন্য রোহিঙ্গাদের মধ্যে উৎসাহ উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, এক লাখ রোহিঙ্গা ভাসানচরে চলে গেলে এখানে পরিবেশগত অনেক উন্নয়ন হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, রোহিঙ্গা সঙ্কটের সমাধান কবে হবে, জানে না কেউ। উপরন্তু রোহিঙ্গাদের কারণে স্থানীয়ভাবে নানা সঙ্কট ও সমস্যা জটিল আকার ধারণ করছে প্রতিনিয়ত। স্বরাষ্ট্র, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্ট (২০২০) পর্যন্ত বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়ে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা বর্তমানে ১১ লাখ ১৮ হাজার ৫৭৬ জন। গত ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশে সাত লাখ ৪১ হাজার ৮৪১ জন মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিক বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছে। শুধু নতুন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ক্যাম্পের জন্যই সাড়ে ৬ হাজার একর বনভূমি বরাদ্দ থাকলেও তারা ব্যবহার করছে প্রায় ১০ হাজার একর বনভূমি। সরকার ইতোমধ্যে এক লাখ রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে স্থানান্তরের পরিকল্পনা নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে এ পর্যন্ত দুই দফায় ৪০৬টি পরিবারের প্রায় ৩ হাজার ৪৪৬ জন রোহিঙ্গাকে সেখানে স্থানান্তর করা হয়েছে।
রোহিঙ্গাদের নিয়ে দেশে কাজ করছে প্রায় ১৮০টি দেশি-বিদেশি এনজিও। এরমধ্যে নানা কারণে কয়েকটি এনজিওর কার্যক্রম রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অনিবন্ধিত এনজিওগুলোকেও সেখানে কাজ করতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মিয়ানমার নাগরিকদের সমন্বয়, ব্যবস্থাপনা ও আইন-শৃঙ্খলা সম্পর্কিত জাতীয় নিরাপত্তা কমিটি। রোহিঙ্গাদের আইনি সহায়তাসহ সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সার্বক্ষণিক কাজ করছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। কূটনীতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অন্যদিকে মানবিক সহায়তাসহ অন্যান্য কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের শরণার্থী সেল। এ ছাড়াও কাজ করছে নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়সহ সরকারের অনেকগুলো মন্ত্রণালয় ও সংস্থা। রোহিঙ্গা নাগরিকদের নিরাপত্তা ও নজরদারিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ৩৪টি রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘিরে ১৪২ কিলোমিটারের কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করছে সেনাবাহিনী। এর মধ্যে ১১১ কিলোমিটার বেড়ার কাজ শেষ হয়েছে। এই কাঁটাতারের চারপাশে ওয়াক ওয়ে বা রাস্তা নির্মাণ করা হচ্ছে। নজরদারিতে বসানো হচ্ছে সিসিটিভি ক্যামেরা। ৪৯৫টি শিক্ষা কেন্দ্রের মাধ্যমে রোহিঙ্গা নাগরিক ও তাদের সন্তানদের ইংরেজি ও মিয়ানমারের ভাষা শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র রয়েছে ১৩৪টি।
পুলিশের এপিবিএন-এর দু’টি ব্যাটালিয়ন স্থাপন করা ছাড়াও স্থানীয় পুলিশ, র‌্যাব, আনসার, বিজিবি ও সেনাসদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছে। গঠন করা হয়েছে কুইক রেসপন্স টিম। পর্যটন শিল্পকে রক্ষার জন্যেও বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। মিয়ানমার নাগরিকদের সমন্বয়, ব্যবস্থাপনা ও আইন-শৃঙ্খলা সম্পর্কিত জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, রোহিঙ্গা নাগরিকদের তাদের দেশে ফেরত পাঠানোর জোর কূটনৈতিক তৎপরতা ছাড়াও তাদের নিরাপত্তার জন্য সার্বিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যাতে রোহিঙ্গারা ছাড়াও স্থানীয়রা সেখানে নিরাপদ থাকতে পারে। আপাতত বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে মাদকপাচার নিয়ন্ত্রণ করা।
কক্সবাজার শরনার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার শাহ রেজওয়ান হায়াত বলেন পর্যায়ক্রমে ১ লাখ রোহিঙ্গাকে নোয়াখালী ভাসানচরে নিয়ে যাওয়া হবে। কুতুপালং ক্যাম্প ইনচার্জ খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে স্থানান্তর প্রক্রিয়া চলছে। ইতিমধ্যে দুই দফায় রোহিঙ্গা স্থানান্তরের পর তৃতীয় দফা মঙ্গলবারে স্থানান্তরের দিনক্ষণ ঠিক থাকলেও তা চলতি মাসের শেষের দিকে অনুষ্ঠিত হতে পারে।

Share this post

scroll to top